রোববার   ১৭ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৩ ১৪২৬   ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

বরগুনার আলো
ব্রেকিং:
হলি আর্টিসান মামলার রায় ২৭ নভেম্বর প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো অভিযোগ নেই- গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এফআর টাওয়ারের নকশা জালিয়াতি : বিএনপি নেতা ফারুকসহ ৩জন কারাগারে ছয় দিনের রিমান্ডে সম্রাট প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শুরু: প্রস্তুত ২৯ লাখ শিক্ষার্থী ১৮ বছর বয়সী বাংলাদেশি পেসারের ৮ উইকেট আজ মজলুম জননেতা হামিদ খান ভাসানীর প্রয়াণ দিবস আমিরাতে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা শুরু আজ আমার বাসায় সমস্ত রান্না হয়েছে পেঁয়াজ ছাড়া- প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির টাকা দিয়ে ফুটানি চলবে না : প্রধানমন্ত্রী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নির্মল সম্পাদক বাবু বরগুনায় আয়কর মেলা উদ্বোধন পেঁয়াজ বিমানে উঠে গেছে কাল-পরশু এলেই দাম কমবে- প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মূল বক্তা মোদি প্রধানমন্ত্রী দুবাই যাচ্ছেন আজ স্বেচ্ছাসেবকলীগের সম্মেলন আজ মেসির জাদুতে ব্রাজিলকে হারাল আর্জেন্টিনা আয়কর দিলেন অর্থমন্ত্রী, রিটার্ন দাখিল প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার নির্দেশনায় পুলিশ এখন দক্ষ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
৪৬৮

অপুষ্টিগত সমস্যা এবং তার প্রতিকার

প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর ২০১৮  

malnutrition বা অপুষ্টি সাধারণত খাদ্যে বিদ্যমান গুণগত পদার্থের অভাব বা আধিক্য বুঝায়। এই শব্দের সাথে আমরা পরিচিত থাকলেও severe acute malnutrition শব্দটির সাথে অনেকেই অপরিচিত। severe acute malnutrition বলতে উচ্চতার তুলনায় কম ওজন বুঝানো হয়। বর্তমান বিশ্বে এটি একটি বিপজ্জনক রোগ। এই রোগের বিশেষত্ব হল প্রাপ্তবয়স্কদদের তুলনায় শিশুরা এতে অধিক আক্রান্ত হয়। 2010 সালে বিশ্বে 925 মিলিয়ন মানুষ অপুষ্টির শিকার হয়েছিলেন, যা 1990 সালের পর থেকে 80 মিলিয়ন বৃদ্ধি পেয়েছিল। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন(WHO) এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ৫ বছরের কম শিশুদের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়া শতকরা ৩৫ থেকে ৫০ জনই মারা যায়।এতে অতিমাত্রায় খর্বতা, কৃশতা এবং কম ওজন অব্যাহত রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই শিশুদের অপুষ্টি ও কম ওজনসংক্রান্ত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জিত হওয়ার পরেও দেশের পুষ্টি পরিস্থিতি এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে পুষ্টি উন্নয়নে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), স্কেলিং আপ নিউট্রিশন (সান), দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক পুষ্টি সম্মেলন (আইসিএন২) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের মতো বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি পূরণ হওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সারা বিশ্বে দেড় কোটির অধিক শিশু এই রোগে আক্রান্ত। এর দুই তৃতীয়াংশের বসবাস এশিয়াতেই। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউ অব পপুলেশন রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (নিপোর্ট) এবং বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক হেলথ সার্ভে রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী,আমাদের দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের উচ্চমাত্রার অপুষ্টি এখনও বিদ্যমান। দেশে এখনও তীব্র অপুষ্টিজনিত খর্বতা ৩৬ দশমিক ১ ভাগ, কৃশতা ১৪ দশমিক ৩ ভাগ এবং কম ওজন ৩২ দশমিক ৪ ভাগ।


কারণ:


♠ সুষম খাদ্যের অভাব

♠ অপুষ্টিকর খাদ্য

♠ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ

♠ অনিয়মিত জীবনযাপন

♠ বাচ্চাদের প্রতি সচেতনতার অভাব

♠ অপরিমিত শরীরচর্চা

♠ খাবারের প্রতি অনীহা

♠ অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির খাদ্য গলাধঃকরণেও সমস্যা হয়

♠ ব্যাচেরলরদের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাসের এই রোগের অন্যতম কারণ

♠ প্রেগন্যান্ট মহিলাদের নিরক্ষরতা

♠ দারিদ্র‍্য


উপসর্গ:


→ খাদ্যে অথবা পানীয়তে অরুচি দেখা দেয়


→ ব্যক্তি অধিকাংশ সময় কাহিল থাকে


→ ব্যক্তির মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়


→ মনোনিবেশে ত্রুটি দেখা দেয়


→ শীত অনুভূত হয়


→ ঘা শুকাতে অথবা সুস্থ হতে সময় লাগে


→ সার্জারীর পর বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দেয়


আরো জটিলতর সমস্যা হলে তখন ব্যক্তির


→ শ্বাসপ্রশাসে সমস্যা দেখা দেয়


→ ত্বক শুকিয়ে যায়,হলদেটে হয়ে যায়,শীতল অনুভূত হয়


→ মাথার চুল কোঁকড়া হয়ে যায়,চুল পড়া আরম্ভ হয়


→ কোন কোন ক্ষেত্রে হৃদরোগেরও সমস্যা দেখা দেয়


→ শিশুদের বার্ধক্যজনিত সমস্যা দেখা দেয়। কোন বিষয় বুঝতে বা শিখতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় নেয়।


→ এমনকি খাদ্য পরিপাকেও সমস্যা দেখা দেয়


চিকিৎসা:


 এলাকাতে যদি কোন খাবার বিতরণ কেন্দ্র থাকে তবে শিশুটিকে সেখানে নিয়ে ‍যান, বা আপনাকে নিজেকেই হয়তো এই সেবাটি দিতে হবে। নীচের উপদানগুলোর যোগান ব্যবস্থাই এই মারাত্মক অপুষ্টি দূর করতে পারে।

খাবার।

পানীয় (জলপূর্ণতা)।



উষ্ণতা, বিশেষ করে রাতে।

ঔষধ।

তীব্র পুষ্টিহীনতা একটি অসুস্থতা এবং এর জন্য ঔষধের প্রয়োজন। তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা একটি শিশুর বিভিন্ন সংক্রামণ হওয়ার সম্ভাবনাও অনেক। কিন্তু তার দেহ এতোই দুর্বল যে সে কোন চিহ্ন দেখাতে পারে না, যেসব চিহ্ন সাধারণতঃ আমাদেরকে বলে দেয় যে কেউ একজন অসুস্থ হয়েছে। এই কারণে এমনকি তার যদি কোন জ্বর নাও থাকে বা দৃশ্যত কোন সংক্রামণ দেখা নাও যায় সংক্রামণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে তাকে ঔষধ দিন। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অবশ্যই জরুরী।


কিভাবে বুঝবেন শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে: 


শিশুর দিকে ভাল করে নজর দিন। একটি পুষ্টিহীন শিশুর অবস্থা খুব দ্রুত মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে, এবং তার যত্নশীল মনোযোগ প্রয়োজন।

আপনি যখন পানীয় এবং খাবার দেয়া শুরু করবেন, তখন তার হৃদস্পদন ও নিশ্বাস-প্রশ্বাসের হার পরীক্ষা করে দেখুন। আপনি জলপূর্ণতার পানীয় দিতে থাকার সময় যদি এগুলো বেড়ে যায় তবে তা দেওয়া বন্ধ করুন এবং চিকিৎসা সহায়তা গ্রহণ করুন। তার হৃদপিণ্ডের হয়তো এই পানীয় মানিয়ে নিতে সমস্যা হচ্ছে। শিশুটি কি ভাল হচ্ছে? কয়েক দিন পর যদি সে ভাল না হয়, তবে তার কোন সংক্রামণ বা অসুস্থ্যতা আছে যা তার জন্য আরও সমস্যার সৃষ্টি করছে। আপনার হয়তো কোন হাসপাতালে যেতে হবে। এছাড়াও শিশু যদি কোন সময় অচেতন হয়ে যায় (অজ্ঞান হয়ে যায়), তার খিঁচুনী ওঠে, বা তার জ্বর হয়, ৩৮ºসে (১০০.৪ºফা) বা তার বেশী তবে অতিরিক্ত সাহায্য গ্রহণ করুন।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অপুষ্টিজনিত সমস্যা অনেক বেশি আকারে দেখা দেয়। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে এই সমস্যা বেশি হওয়ারই কথা। এছাড়া সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা প্রকটরুপ ধারণ করেছিল। এ রকম শিশু কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে হরহামেশাই চোখে পড়ে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য, খাদ্যাভাব ও অশিক্ষা এসব অপুষ্টির কারণ। রোহিঙ্গারা এর সবকিছুর শিকার। তাই অপুষ্টিও এদের মধ্যে বেশি।২৫ আগস্ট থেকে আসা রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরের ৫৯’৬০৪ শিশু উপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে ১,৯৭০ শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে। আবার তাদের মধ্যে ৬,৯৭১ জন শিশু মধ্যপরিমিত অপুষ্টির শিকারে ভুগছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। ২০১৭ মে এর পর থেকে শরণার্থী শিবিরে এই অপুষ্টির হার জরুরি অবস্থাকে ছাড়িয়ে গেছে। সারাবিশ্বে ২১.২% চরম অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে এই শিবিরেঈ  রয়েছে ৩.৬%।



প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও কিশোরীদের মধ্যে অপুষ্টি বিদ্যমান এবং অঞ্চলভেদে এর ব্যাপকতার পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় জেলাগুলো এবং হাওর অঞ্চল বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে শহর এলাকায় পুষ্টি পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো হলেও শহুরে বস্তির অবস্থা বেশ খারাপ। বস্তিতে কিশোরী গর্ভধারণও বেশি।


শিশুদের এই অপুষ্টিজনিত সমস্যা দূরীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে মায়েদের মধ্যে শিক্ষা এবং সচেতনতার রাস্তা সুগম করা। বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং গ্রামেগঞ্জে এখনো এই ভয়াবহ রোগের কারণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে অবগত নয়। শিশুদের অপর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রবণতা, খাবারে বৈচিত্র্যহীনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলাকে এই অবস্থার জন্য দায়ী করা যায়। ভিটামিন এ, আয়রন, আয়োডিন, জিংক, ভিটামিন বি-১২ এবং ফলেটের মতো অনুপুষ্টি কণার ঘাটতির কারণে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের পাশপাশি গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়েরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


তবে শুধু মায়েদের মধ্যে শিক্ষা বা সচেতনতার অভাবই নয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, দেশে অনেক মা এখন শিশুকে বুকের দুধ না খাওয়ানোকে ফ্যাশন হিসেবে নিয়েছেন। তারা মনে করেন বুকের দুধ খাওয়ালে মায়েদের স্বাস্থ্যহানি হতে পারে। এছাড়া শহুরে মায়েদের মধ্যে কৌটার দুধ খাওয়ানোর প্রতি বেশি আগ্রহ দেখা যায়। মোহাম্মদ নাসিম এসব ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে পুষ্টিসমৃদ্ধ জাতি গড়তে জন্মের পর পরই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে মায়েদের অনুরোধ জানান। এছাড়া বড় শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ফাস্ট ফুডের পরিবর্তে দেশি ফল খাওয়াতে মায়েদের অনুরোধ করেন। সরকার দ্বিতীয় জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এতে রয়েছে, দেশের মানুষের বিশেষ করে শিশু, কিশোরী, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মাসহ সব নাগরিকের পুষ্টি অবস্থার উন্নতি করা। এ পরিস্থিতির উন্নয়নে করণীয়সমূহ বাস্তবায়নে সরকার দ্বিতীয় জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনা (২০১৬-২৫) প্রণয়ন করেছে।