• শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০২৪ ||

  • শ্রাবণ ৩ ১৪৩১

  • || ১১ মুহররম ১৪৪৬

বরগুনার আলো
ব্রেকিং:
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ২১ জুলাই স্পেন যাবেন প্রধানমন্ত্রী আমার বিশ্বাস শিক্ষার্থীরা আদালতে ন্যায়বিচারই পাবে: প্রধানমন্ত্রী কোটা সংস্কার আন্দোলনে প্রাণহানি ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা হবে মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতে হবে : প্রধানমন্ত্রী পবিত্র আশুরা মুসলিম উম্মার জন্য তাৎপর্যময় ও শোকের দিন আশুরার মর্মবাণী ধারণ করে সমাজে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান মুসলিম সম্প্রদায়ের উচিত গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া নিজেদের রাজাকার বলতে তাদের লজ্জাও করে না : প্রধানমন্ত্রী দুঃখ লাগছে, রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও বলে তারা রাজাকার শেখ হাসিনার কারাবন্দি দিবস আজ ‘চীন কিছু দেয়নি, ভারতের সঙ্গে গোলামি চুক্তি’ বলা মানসিক অসুস্থতা দেশের অর্থনীতি এখন যথেষ্ট শক্তিশালী : প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সরকার ব্যবসাবান্ধব সরকার ফুটবলের উন্নয়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে সরকার যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করুন চীন সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসছেন প্রধানমন্ত্রী টেকসই উন্নয়নে পরিকল্পিত ও দক্ষ জনসংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম বাংলাদেশে আরো বিনিয়োগ করতে চায় চীন: শি জিনপিং চীন সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী চীন সফর সংক্ষিপ্ত করে আজ দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী

টাঙ্গাইল শাড়ি আমাদের ২০০ বছরের ঐতিহ্য, ভারতের মালিকানা দাবি ভুয়া

বরগুনার আলো

প্রকাশিত: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইলের শাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ায় শাড়ির উৎপত্তিস্থল টাঙ্গাইলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবিকে ‘ভুয়া’ জানিয়ে জিআই বাতিল করে এটিকে বাংলাদেশের পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলেছেন শাড়ির ব্যবসায়ী, কারিগর ও সচেতন নাগরিক সমাজ। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে টাঙ্গাইলে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ব্যবসায়ী, কারিগর ও তাঁতিরা। এখনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

টাঙ্গাইল শাড়ির ব্যবসায়ী, কারিগর ও তাঁতিরা জানিয়েছেন, প্রায় ২০০ বছর ধরে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক টাঙ্গাইলের শাড়ি। যা নিজস্ব ঐতিহ্য বহন করে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সুনাম কুড়িয়েছে। এই শাড়ি ঘিরে টাঙ্গাইলের একটি স্লোগান আছে। তা হলো, ‘নদী চর খাল বিল গজারির বন, টাঙ্গাইল শাড়ি তার গর্বের ধন।’ সদর উপজেলার বাজিতপুর, কৃষ্ণপুর, দেলদুয়ারের পাথরাইল, কালিহাতীর বল্লা, রামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় উৎপাদন হয়। এই শাড়ির রাজধানী হিসেবে খ্যাত পাথরাইল ইউনিয়ন। পাথরাইল ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে সারা বছর শাড়ি তৈরি হয়। এখানে তাঁত শাড়ি উৎপাদন ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তিন শতাধিক পরিবার। ঈদ, পয়লা বৈশাখ ও শারদীয় দুর্গাপূজার সময় এখানে পাইকারি ও খুচরা বাজার বেশ জমে ওঠে। বছরজুড়ে দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারতে প্রচুর পরিমাণ রফতানি হয়ে আসছে। পাশাপাশি অন্যান্য দেশেও রফতানি হচ্ছে। বাঙালি নারীদের প্রথম পছন্দ এই শাড়ি। অথচ সেটিকে ভারত কীভাবে নিজেদের বলে নিবন্ধন করলো, তা বুঝে আসছে না ব্যবসায়ী ও তাঁতিদের।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে টাঙ্গাইল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক পলাশ চন্দ্র বসাক বলেন, ‘টাঙ্গাইলের শাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে শুনে আমরা হতবাক। মূলত এই তাঁতের শাড়ি আমাদের, এর জন্যই টাঙ্গাইল বিখ্যাত। কারণ শাড়ির উৎপত্তিস্থল এটি। বসাক সম্প্রদায়ের গর্ব এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক আমরা। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কীভাবে এই শাড়িকে নিজেদের দাবি করলো, তা বুঝে আসছে না। এটি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা। খুবই কষ্টদায়ক বিষয়। তাদের জিআই বাতিল করে দ্রুত সময়ের মধ্যে আমাদের ঐতিহ্য আমাদের ফিরিয়ে দিতে হবে। না হয় আমাদের ক্ষোভ ও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’  

এই শাড়ি টাঙ্গাইলের ২০০ বছরের ঐতিহ্য ও গর্ব বলে উল্লেখ করেছেন টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন। তিনি বলেন, ‘শত বছর ধরে আমাদের বাপ-দাদারা এই শাড়ির ব্যবসা করে আসছেন। ভারতের দাবির কোনও যৌক্তিকতা নেই। তাদের দাবি অগ্রহণযোগ্য ও ভুয়া। বিষয়টি শোনার পর আমরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক করেছি। যাতে আমাদের ঐতিহ্যকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রয়োজনে আমরা এ নিয়ে আপিল করবো।’

কোথায় টাঙ্গাইল আর কোথায় ভারত অথচ তারা আমাদের শাড়ি নিবন্ধন করে বসলো, এটি আমাদের সঙ্গে তামাশা ছাড়া কিছুই নয় বলে জানিয়েছেন টাঙ্গাইল শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক।

তিনি বলেন, ‘আমরা টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপাদক। শুধু আমরা নয়, আমাদের পূর্ববর্তী কয়েক প্রজন্ম শত শত বছর ধরে এই শাড়ি উৎপাদন করে আসছে। রাজশাহীতে টাঙ্গাইল শাড়ি উৎপাদন হবে না, রাজশাহী শাড়ি হতে পারে। রাজশাহীতে টাঙ্গাইল শাড়ি যেমন উৎপাদন হবে না, তেমনি ভারতেও না। কী করে ভারত জিআই হিসেবে নিবন্ধন করে, তাও আবার টাঙ্গাইল নাম ব্যবহার করে। অনেকটা বাবার নাম বাদ দিয়ে মামার নামে পরিচিত হওয়ার মতো অবস্থা। এমন দাবিকে আমরা ঘৃণা করি, ধিক্কার জানাই। তাদের ভুয়া দাবির কারণে আমাদের ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়েছে। আমাদের ঐতিহ্য যদি আমাদের নামে রেকর্ডভুক্ত না হয়, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। এখনই জিআই বাতিল করতে হবে তাদের।’

টাঙ্গাইলকে বাদ দিয়ে টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই ভারতকে দেওয়া মেনে নেবো না উল্লেখ করে রঘুনাথ বসাক আরও বলেন, ‘ওদের (ভারত) বক্তব্যে বলেছে, তারা নাকি টাঙ্গাইলের অধিবাসী। অথচ তারও আগে অর্থাৎ স্বাধীনতার দেড়শ বছর আগে থেকে এখানে টাঙ্গাইল শাড়ি উৎপাদন হয়। স্বাধীনতার পর আমরা কিছু সংখ্যক তাঁতশিল্পী নতুন করে এই পেশায় যুক্ত হয়েছি। আবেদনে ওরা নিজেরাই স্বীকার করে গেছে, টাঙ্গাইলের অধিবাসী। তাদের বক্তব্যেই বোঝা যায়, অর্জিন টাঙ্গাইল। তাহলে তারা কীভাবে বাজারজাত করে টাঙ্গাইল শাড়ি নাম দিয়ে। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। টাঙ্গাইল হলো অর্জিন। টাঙ্গাইলকে বাদ দিয়ে টাঙ্গাইল শাড়ি হবে না। আমাদের দেশের যারা জিআই পাওয়া নিয়ে কাজ করেন, তারা কেন জানি পিছিয়ে পড়েছেন। কেন এতদিন জিআই নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেননি বা করতে উৎসাহিত করেননি তারা? আগে আবেদন করতে হবে তো, সন্তান কান্না না করলে মা দুধ দেয় না, আমরা আবেদন না করলে পাবো কীভাবে। আমাদের যারা দায়িত্বশীল তারা বিষয়টিকে নিয়ে অবহেলা করায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’

টাঙ্গাইলের চমচম নিয়ে আবেদন করেছে, এটির জিআই স্বীকৃতি পেয়ে গেছে জানিয়ে ব্যবসায়ী এই নেতা আরও বলেন, ‘কিন্তু টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে আবেদন করা হয়নি। চমচমের আগে শাড়ি নিয়ে আবেদন করা উচিত ছিল দায়িত্বশীলদের। আমার বিশ্বাস, এখনও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আবেদন করলে আমরাই জিআই স্বীকৃতি পাবো। আমার মনে হয়, ভুল হয়েছে আমাদের। জেলা প্রশাসকের ভুল ধরবো না। আবেদন করার এখনও সময় আছে। ভারতের জিআই বাতিল করে আমাদের পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি চাই এবং দিতে হবে।’  

শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্পনকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদফতর (ডিপিডিটি) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের দফতর, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড বা বিসিকের (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন) পক্ষ থেকে টাঙ্গাইল শাড়ির জিআইয়ের আবেদন করা হয়নি। আবেদন করলে তা বিবেচনা করা হবে।  

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. কায়ছারুল ইসলাম বলেন, ‘টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই স্বীকৃতি পেতে ভারতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করবো। আমরা আবেদনের কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। আশা করছি, দুই-তিন দিনের মধ্যে আবেদন সম্পন্ন হয়ে যাবে।’

পাথরাইলের কৃষ্ণনগর গ্রামের তাঁতশ্রমিক মো. সেলিম বলেন, ‘টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপত্তিস্থল টাঙ্গাইল। বছরের পর বছর আমরা এই শাড়ি উৎপাদন করে আসছি। এটি আমাদের বাপ-দাদার সম্পদ। জিআই নিবন্ধন পেলে বাংলাদেশ পাবে। ভারত কীভাবে পায়? তাদের জিআই বাতিল করে আমাদের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানাই। কারণ এটি আমাদের কষ্টের ফসল।’

জন্ম থেকে টাঙ্গাইলের তাঁতের সঙ্গে জড়িত জানিয়ে একই গ্রামের আরেক তাঁতশ্রমিক শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভারতের দাবি ভুয়া ও দুঃখজনক। টাঙ্গাইল শাড়ি জন্মস্থল টাঙ্গাইল। ভারতের দাবি করার কোনও সুযোগ নেই। অবশ্যই তাদের জিআই বাতিল করতে হবে।’

তিন পূর্বপুরুষ থেকে আমরা তাঁতের সঙ্গে জড়িত উল্লেখ করে পাথরাইলের তাঁত মালিক সচীন রাজবংশী বলেন, ‘টাঙ্গাইল শাড়ির উৎপত্তিস্থল টাঙ্গাইল। এই শাড়ি ভারতের দাবি করা উচিত হয়নি। এমনিতেই তাঁত টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে আমাদের। তার ওপর আবার ভারত তাদের দাবি করে কীভাবে? ভারতের জিআই বাতিল করে বাংলাদেশের পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জোর দাবি জানাই আমরা।’

টাঙ্গাইল শাড়ি টাঙ্গাইলের সৃষ্টি উল্লেখ করে পাথরাইলের তাঁত মালিক বাদল রাজবংশী বলেন, ‘এটি টাঙ্গাইলের ঐতিহ্য, বাংলাদেশের গর্ব। ২০০ বছর ধরে এই শাড়ি উৎপাদন করছি আমরা। ভারত এটি নিজেদের দাবি করলেই হলো। আমরা আমাদের ঐতিহ্য রক্ষায় আন্দোলন চালিয়ে যাবো।’

প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার (০১ ফেব্রুয়ারি) ভারতের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে করা একটি পোস্টে বলা হয়েছে, টাঙ্গাইল শাড়ি, পশ্চিমবঙ্গ থেকে উদ্ভূত, একটি ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা মাস্টারপিস। এর মিহি গঠন, বৈচিত্র্যময় রঙ এবং জামদানি মোটিফের জন্য বিখ্যাত। এটি এই অঞ্চলের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। টাঙ্গাইলের প্রতিটি শাড়ি ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধ সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে দক্ষ কারুকার্যের নিদর্শন।’ এরপর থেকে টাঙ্গাইলসহ সারাদেশে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে।

গত শনিবার দুপুরে টাঙ্গাইল শাড়ি বাংলাদেশি পণ্য হিসেবে জিআই স্বীকৃতির দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে সচেতন নাগরিক সমাজ। এতে বক্তব্য রাখেন শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুঈদ হাসান তড়িৎ, সমাজকর্মী নাদিউর রহমান আকাশ, আহসান খান আকাশ ও মির্জা রিয়ান প্রমুখ।

বরগুনার আলো